হলুদের যত স্বাস্থ্যগুণের দাবি, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা জোরালো?

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪১ দুপুর
  • ৪৪৯১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

রান্নায় রং, স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে হলুদের ব্যবহার বিশ্বজুড়েই বহুল প্রচলিত। বাংলাদেশের মাছের ঝোল, ভারতের চিকেন কারি, সুদানের উটের বিরিয়ানি কিংবা মালয়েশিয়ার লাকসা—বিভিন্ন দেশের খাবারে গুরুত্বপূর্ণ মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয় হলুদ। শুধু খাবারেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বহুদিন ধরে হলুদকে ঔষধি উপাদান হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। তবে হলুদের স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে প্রচলিত দাবিগুলোর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কতটা শক্তিশালী—এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত খাদ্য গবেষক ও পডকাস্টার রাগিনি কাশ্যপের মতে, হলুদের সঙ্গে খাবার ও সংস্কৃতির পাশাপাশি মানুষের আবেগও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তার পরিবারের শিকড় ভারতের পাঞ্জাবে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই খাবারে হলুদের ব্যবহার দেখে আসছেন তিনি।

বিশ্বে হলুদের প্রায় ৩০টি জাত রয়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের রান্নায় এর ব্যবহার রয়েছে। দক্ষিণ এশীয়দের অভিবাসনের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চল পর্যন্তও ছড়িয়ে পড়েছে হলুদের ব্যবহার।

প্রাচীনকাল থেকেই ঔষধি ব্যবহারের প্রচলন

হলুদের ঔষধি ব্যবহার আধুনিক কোনো প্রবণতা নয়। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের বিভিন্ন লেখাতেও এর ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে হলুদকে জীবাণুনাশক ও প্রদাহনাশক গুণসম্পন্ন উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে।

ভারতীয় সংস্কৃতিতেও হলুদের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিয়ের আগে বর-কনের শরীরে হলুদ মাখানোর রীতি দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত। সৌন্দর্যচর্চা ও বিভিন্ন শুভ অনুষ্ঠানেও এর ব্যবহার রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোতেও হলুদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। হাড় ও জয়েন্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং শরীরের প্রদাহ কমানোর মতো নানা দাবিতে হলুদ ও কারকিউমিনের সাপ্লিমেন্ট বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব পণ্যের মূল আকর্ষণ হলুদের অন্যতম সক্রিয় যৌগ কারকিউমিন।

কারকিউমিন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

হলুদের স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল সবসময় এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার রসায়নবিদ ড. ক্যাথরিন নেলসন কারকিউমিন নিয়ে শতাধিক গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করেছেন।

তার মতে, কারকিউমিনকে ঘিরে এমন অনেক দাবি রয়েছে, যাতে মনে হয় এটি প্রায় সব ধরনের শারীরিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু গবেষণায় এসব দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কারকিউমিনের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও গবেষণাকে জটিল করে তোলে। এটি সহজে শরীরে শোষিত হয় না এবং মুখে খাওয়ার পর খুব সামান্য পরিমাণ রক্তে পৌঁছায়। পরীক্ষাগারে এর কিছু বৈশিষ্ট্য গবেষণার ফলাফলকে বিভ্রান্ত করতে পারে বলেও মনে করেন গবেষকরা।

কারকিউমিনের শোষণ বাড়াতে অনেক সময় হলুদের সঙ্গে কালো মরিচ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এতে কারকিউমিনের স্বাস্থ্য উপকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।

বড় গবেষণাতেও মেলেনি প্রত্যাশিত সুফল

হলুদ ও কারকিউমিন নিয়ে কয়েক দশক ধরে অসংখ্য গবেষণা হয়েছে। তবে এসব গবেষণার ফল অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী। কানাডার লন্ডন হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অমিত গার্গের নেতৃত্বে পরিচালিত দুটি বড় গবেষণাতেও প্রত্যাশিত সুফলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রথম গবেষণায় প্রায় ৬০০ রোগীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা হয়, অস্ত্রোপচারের পর কারকিউমিন কিডনির ক্ষতি ও প্রদাহ কমাতে পারে কি না। কিন্তু এতে কারকিউমিনের উল্লেখযোগ্য কোনো উপকারী প্রভাব পাওয়া যায়নি।

পরবর্তী গবেষণায় কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে কারকিউমিনের ক্ষুদ্র কণার একটি বিশেষ ফর্ম ব্যবহার করে কিডনির কার্যকারিতা উন্নত করা বা রোগের অগ্রগতি ঠেকানো সম্ভব কি না পরীক্ষা করা হয়। সেখানেও এর কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি।

গবেষকদের প্রত্যাশা ছিল, হলুদের উপকারিতা নিয়ে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে গবেষণার ফল ইতিবাচকভাবে মিলবে। কিন্তু পরীক্ষার ফল তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করেনি।

রান্নার হলুদ আর সাপ্লিমেন্ট এক নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, রান্নায় স্বাভাবিকভাবে হলুদ ব্যবহার এবং হলুদের কোনো নির্দিষ্ট যৌগকে আলাদা করে সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ হিসেবে গ্রহণ—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।

স্বাভাবিক খাবারের অংশ হিসেবে হলুদ খাওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সাধারণত আপত্তি নেই। তবে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা বা প্রতিরোধের নিশ্চয়তা হিসেবে দামি হলুদ কিংবা কারকিউমিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

অধ্যাপক অমিত গার্গের মতে, অনেক প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যপণ্য প্রচলিত ওষুধের মতো কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকে না। ফলে কোনো পণ্যের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য উপকারের দাবি করা হলে তার পক্ষে শক্ত ও উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকা জরুরি।

সব মিলিয়ে রান্নাঘরের পরিচিত এই মসলাটি খাবারের অংশ হিসেবে উপভোগ করার ক্ষেত্রে সমস্যা নেই। তবে হলুদ বা কারকিউমিনকে ‘অলৌকিক ওষুধ’ হিসেবে বিবেচনা করার আগে এর স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সীমাবদ্ধতা মনে রাখা জরুরি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad